প্রকাশিত: August 26, 2026
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে তদন্তে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার দুই আসামির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। পরে ছাদে ধরা পড়ার পর মানসম্মানের ভয়ে একে একে পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাসখানেক ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে এক বা দুই পিস করে ইয়াবা সেবন করতেন সিদ্ধার্থ দাস। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাড়িতে যান তিনি। সেখানে তারা তিন পিস ইয়াবা সেবন করেন। তবে সীমান্ত মাদক সেবন করতেন না বলে জানা গেছে।
মধ্যরাতে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছে হলে শান্ত নামের এক মাদক কারবারির কাছ থেকে কয়েক পিস ইয়াবা কেনেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। পরে প্রতিবেশী দেবুদের তিনতলা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নির্মাণাধীন দোতলার ছাদ দিয়ে পাশের গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন তারা। দেবুর বাড়ির গেটে কুকুর থাকায় দেওয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন দুজন।
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে ভোরের আলো ফুটে যায়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে ওই রাতে তারা মোট আট পিস ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, এর আগে সিদ্ধার্থ ওই ছাদে এক-দুদিন ইয়াবা সেবন করলেও মুগ্ধ সেদিনই প্রথম সেখানে যান। গ্রেপ্তারের পর তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে এসব তথ্য স্বীকার করেছেন সিদ্ধার্থ দাস। ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বাড়িতে ছিলেন না বলেও তাদের অভিভাবকরা জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ভোরের দিকে ছাদে ওঠেন বাড়ির মালিক গণপতি চক্রবর্তী। সেখানে দুজনকে দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এরপর ধরা পড়ে যাওয়া এবং মানসম্মানের ভয়ে গণপতির ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। এ সময় তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তিও হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যার পর গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছাদের এক কোণে রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। টিনের শব্দ শুনে কিংবা অন্য কোনো কারণে ছাদে উঠে আসেন তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে ওঠার পর মুগ্ধ গামছা দিয়ে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা পেঁচিয়ে ধরেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন। প্রীতিলতাকে হত্যার পর দুজনে মিলে পাশে থাকা রশি ও গামছা দিয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
পাশের ছাদ থেকে মরদেহগুলো যেন দেখা না যায়, সেজন্য মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে এনে রাখা হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।
এরপর নিচতলায় নেমে ঘুম থেকে জেগে বিছানায় বসে থাকা আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে দেখতে পান তারা। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করেন দুজন।
বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে এমন সন্দেহ থেকে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ। দীর্ঘ সময় ধরে এসব ঘটনার পর ক্লান্ত হয়ে পড়লে তারা ওই বাড়িতেই গোসল করেন। এরপর সেখানে বসে আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন এবং খেজুর ও শসা খান বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে পরে তারা ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখা হয়। পরে বাড়ি থেকে কিছু সোনার গয়না ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যান তারা।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ হাজার টাকা নেন মুগ্ধ। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে মাটিতে সোনার গয়না পুঁতে রাখেন। এ বিষয়ে পূর্ণিমা কিছু জানতেন না। পেশায় স্বর্ণকার সিদ্ধার্থ একটি বাসায় গয়না বের করে আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন বলেও তদন্তে তথ্য মিলেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার বিভিন্ন আলামত হিসেবে খেজুরের বিচি, আগুনে পোড়ানো গয়নার চিহ্ন এবং ইয়াবা সেবনের উপকরণ জব্দ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করে পুলিশ। পরে বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনার পর তিনি একটি ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসাও নেন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। পরে মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান তিনি। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধাওয়া করার পর তুতফার্ম এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুজনই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশের দাবি।
আমার আর বোধ হয় চাকরি করা হলো না, ফেসবুকে এসপির আবেগঘন পোস্ট
তবে তদন্ত এখনও চলমান বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়ালেও মামলার তদন্ত করছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফরেনসিক ও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ও চূড়ান্ত রূপরেখা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, মামলার তদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় এখানে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে।