প্রকাশিত: September 26, 2026
হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে নরসিংদী শহরের মদের দোকান বন্ধের দাবি জানিয়েছেন জেলা যুবদল সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ। এরই মধ্যে জনরোষের মুখে শুক্রবার সন্ধ্যায় মদের দোকানটিতে তালা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নরসিংদী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি লাইসেন্সধারী দেশীয় মদের দোকানে বিনামূল্যে ১০ লিটার মদ না দেওয়ায় দোকানের কর্মচারী তানভীর আহমেদ রাব্বির শরীরে প্রকাশ্য দিবালোকে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়।
মর্মান্তিক এ ঘটনার পর নরসিংদীজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শহরে মদের দোকান বন্ধের দাবি জানান মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ।
তিনি বলেন, ১৯৯৯ সালে নরসিংদীর এই মদের দোকানে বিষাক্ত মদপানের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় ১১৩ থেকে ১১৭ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া ওই সময় স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ববরণ করেছিল একাধিক ব্যক্তি। সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির পরও কিভাবে শহরের জনবহুল এলাকায় এমন একটি দোকান বহাল তবিয়তে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
এদিকে শহরের মধ্যে প্রকাশ্যে মদ বিক্রির কারণে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠলে যুবসমাজসহ সর্বসাধারণের অসুবিধার কথা চিন্তা করে শুক্রবার সন্ধ্যায় মদের দোকানে তালা লাগিয়ে দেন জেলা যুবদল সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ এবং জেলা ছাত্রদল সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নাহিদ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নরসিংদী শহরের বাজির মোড় এলাকায় লাইসেন্সধারী দেশীয় মদের দোকানে বিনামূল্যে ১০ লিটার মদ দাবি করেন আবাসিক হোটেল নিরালার মালিক জাহাঙ্গীর সরকারের ছেলে জাহিদ সরকারসহ কয়েকজন। মদ না দেওয়ায় তারা দোকানের কাউন্টারে থাকা কর্মচারী তানভীর আহমেদ রাব্বির (৩০) শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে তাকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউতে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার বিকালে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় রাব্বির মা মিনু বেগম বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় জাহাঙ্গীর সরকার ও তার ছেলে জাহিদ সরকারসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর সরকার ও কাজী তৌফিক আহমেদ ওরফে পিয়াসকে (৩০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মদের দোকানের কারণে এলাকায় আইনশৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। মদের নেশায় মত্ত হয়ে যুবসমাজ চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে শহরের মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাছাড়া ১৯৯৯ সালের ৭ মে নরসিংদীর এই মদের দোকানে বিষাক্ত মদপানের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল।
নরসিংদী জেলা যুবদল সভাপতি ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ বলেন, এই মাদকের কারণে শহরে চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে। নেশার জন্য প্রকাশ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে হতে পারে না। তাছাড়া নরসিংদী সরকারি কলেজসহ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিসন্নিকটে এ মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের আগামী প্রজন্ম তথা শিক্ষার্থীরা বিপথে চলে যেতে পারে। তাই খুনখারাবি, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বন্ধে শহরে মদের দোকান বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে কথা বলতে দেশীয় মদের দোকানের মালিক রুবেল মিয়া ও ম্যানেজার হাসেম মিয়ার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আশিকুর রহমান বলেন, মদের দোকানকে কেন্দ্র করে যদি আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা চুরি-ছিনতাই বেড়ে যায়, তাহলে আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। তবে যেহেতু দোকানটির লাইসেন্স সরকারের একটি ভিন্ন দপ্তর ইস্যু করেছে, তাই স্থানান্তর বা বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত সেই দপ্তরকেই নিতে হবে।