প্রকাশিত: October 1, 2026
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা জোরদারে দিল্লিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী পুলিশ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ ‘পিংক ফোর্স’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর স্কুল, কলেজ, মেট্রো স্টেশন, বাজার ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল দেওয়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল সময়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এ বাহিনী কাজ করবে।
সম্প্রতি দিল্লিতে প্রায় ১০ দিনের ব্যবধানে নাবালিকাদের ওপর পৃথক চারটি ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা সামনে আসার পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর তারানজিত সিং সাধু দিল্লি পুলিশকে গোয়া পুলিশের ‘পিংক ফোর্স’-এর আদলে নতুন এই বাহিনী গঠনের নির্দেশ দেন। রাজধানীর বিভিন্ন ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে নারী পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হবে।
নতুন এই বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হবে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি দৃশ্যমান করা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। নারী পুলিশ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই ইউনিট স্কুল, কলেজ, মেট্রো স্টেশন ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিয়মিত টহল দেবে।
গোয়ায় ‘পিংক ফোর্স’ মূলত নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কাজ করে। দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর এই বাহিনীকে নতুন ইউনিটের মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে নারী পুলিশ সদস্যদের দিয়ে টহল দেওয়া দিল্লি পুলিশের জন্য নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। এর আগে স্কুল, কলেজ, বাজার, মেট্রো স্টেশন ও জনবহুল এলাকায় নারী কর্মকর্তাদের স্কুটি ও বিট পেট্রোলিংয়ে মোতায়েন করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো এসব টহল কার্যক্রমকে একটি নির্দিষ্ট ‘পিংক ফোর্স’ কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা।
এ ছাড়া ‘অপারেশন শিষ্টাচার’-এর আওতায় প্রকাশ্য স্থানে নারীদের উত্ত্যক্ত করা বন্ধে আইনি অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও গণপরিবহন কেন্দ্রগুলোতে ইতোমধ্যে টহল জোরদার রয়েছে। প্রস্তাবিত ‘পিংক ফোর্স’ এসব উদ্যোগের পাশাপাশি কাজ করবে।
সম্প্রতি চার যৌন নিপীড়নের ঘটনা
সর্বশেষ ঘটনায় কালকাজি মন্দিরের কাছে আস্থা কুঞ্জ পার্কে ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরীকে তিন ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে প্রথমে ওই কিশোরীকে তার পুরুষ বন্ধুর কাছ থেকে আলাদা করে।
পরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সদর বাজারে স্টেশনারি কিনতে গিয়ে একটি দোকানের ভেতর এক নাবালিকা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া মধ্য দিল্লির কিষাণগঞ্জে ছয় বছর বয়সি এক শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পুলিশ জানায়, স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্বরূপ নগরে ১৬ বছর বয়সি এক কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ১৯ বছর বয়সি এক তরুণকে গ্রেফাতার এবং তিন নাবালককে আটক করা হয়েছে।
ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আসছে পুলিশি অভিযোগ
গত ২৪ জুনের পর দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরে সান্ধুর দ্বিতীয় সফরের সময় ‘পিংক ফোর্স’ গঠনসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এখন থেকে দিল্লি পুলিশের ‘জন শুনানি’ কর্মসূচিতে পাওয়া অভিযোগগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্র্যাক করা হবে। প্রতিটি অভিযোগের প্রাপ্তিস্বীকার দেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্য সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
গত জুন থেকে বিভিন্ন থানায় ‘জন শুনানি’ কর্মসূচি চলছে। চলতি মাসে পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০টির বেশি সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার অভিযোগের সমাধান করা হয়েছে। তবে নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
এ ছাড়া অপরাধপ্রবণ ও জনবহুল এলাকায়—বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, বাজার ও পরিবহন হাবের আশপাশে—পায়ে হেঁটে এবং মোটরসাইকেলে টহল বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে থানা ও বিট কর্মকর্তাদের।
প্রতিটি পুলিশ ডিস্ট্রিক্টে একজন নোডাল অফিসার নিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি স্কুলগুলোতে পিওসিএসও আইন, শিশু সুরক্ষা, সাইবার অপরাধ, মাদকের অপব্যবহার ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক সেশনের জন্য ত্রৈমাসিক ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ দমন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। থানাগুলোকে সাইবার অপরাধের অভিযোগ মোকাবিলা এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণে আরও দক্ষ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পিক আওয়ারে যানজটপ্রবণ প্রধান পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়াতেও বলা হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের কল্যাণের বিষয়টিও নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে নিম্নপদস্থ ও নারী সদস্যদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সান্ধু। একই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ ও ক্ষোভ শোনার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশ আবাসন কলোনিগুলোকে ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন মডেলে রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।