রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় সামনে এলো যে নতুন তথ্য

প্রকাশিত: September 3, 2026

  • শেয়ার করুন

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক ফোনালাপের তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে দুই আসামির মধ্যে ৮০ বার ফোনে কথা হয়েছে। এদিকে সিদ্ধার্থের বাবা ও কাকার বাড়ি বিক্রি করে স্বপরিবারে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনার তথ্যও সামনে এসেছে।

 

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী জানান, গত ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৮০ ঘণ্টার সিডিআর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তার দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধের একটি নম্বরে ৩০ বার ফোন করেন। প্রতিটি কলের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড।

 

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কয়েকটি কলে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকায় সন্দেহভাজনের তালিকাও বড় হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে ৩০ বার ফোনালাপের বিষয়টিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস মামাতো ও ফুফাতো ভাই। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল নিহত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির লাগোয়া।

 

হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তারা প্রতিবেশী স্বর্ণের দোকানের মালিক বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় বাড়িটি বিক্রির জন্য বায়না করেন। বাড়ির দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর স্বপরিবারে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

 

জমির ক্রেতা বিধান চন্দ্র দাস জানান, প্রায় দেড় মাস আগে বায়না সূত্রে তিনি জমিটি কিনেছেন। এ বাবদ ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন।

 

জেলগেটে দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদ

 

চার খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে জেলগেটে শেষ দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। বুধবার সকাল ১১টা ১০ মিনিট থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেলা ২টার দিকে তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি তিনি।

 

এর আগে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত প্রথম দফায় দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মঙ্গলবার ও বুধবার দুই আসামিকে জেলগেটে তিন ঘণ্টা করে মোট দুই দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

 

সোমবার রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলাম তাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। পুলিশ তিন দিনের রিমান্ড চাইলেও আদালত তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

 

নতুন তথ্য যাচাই করছে পুলিশ

 

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর তদন্তে আরও কিছু নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই এবং আগের জবানবন্দির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেই আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সবকিছু আমরা মিলিয়ে দেখছি।’

 

তিনি জানান, গত দুই দিনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, ঘটনার আগে ও পরে আসামিদের গতিবিধি এবং তাদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে বিভিন্ন আলামতের মিল খুঁজতেই এ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

 

সনাতন চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘তদন্ত চলমান, এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।’

 

গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকার বাসিন্দা মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। মামলাটি বর্তমানে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।

  • শেয়ার করুন