৭ মাসে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ, সংসদে রুমিন ফারহানার উদ্বেগ

প্রকাশিত: September 6, 2026

  • শেয়ার করুন

 

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য তুলে ধরে জাতীয় সংসদে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে এখনো দুই হাজারের বেশি শিশুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ শিশুদের পরিবার তাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

 

 

 

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দেন রুমিন ফারহানা।

 

 

 

 

সংসদে তিনি বলেন, আইনগত সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সমর্থন, অনুমোদন বা সম্মতিতে কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা হলে সেটিকে গুম বলা হয়।

 

 

কিন্তু শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলো সরাসরি গুমের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।

রুমিন ফারহানা বলেন, গত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে এবং এখনো দুই হাজারের বেশি শিশুর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এসব নিখোঁজ শিশুর পরিবার একটি সভার আয়োজন করে তাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত থাকায় বিষয়টি তার দৃষ্টিতে আবারও আনেন তিনি।

 

 

এ সময় সংসদে বিবেচনাধীন ‘বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর প্রসঙ্গ তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, গত দেড় দশক ধরে আয়নাঘর ও সাদা পোশাকধারীদের আতঙ্ক দেশের জনপদকে ভয়ের রাজ্যে পরিণত করেছিল। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি নীতিগতভাবে বিলটিকে সমর্থন করেন।

 

 

তবে এমন মানবতাবিরোধী ও জঘন্য অপরাধের আইন তাড়াহুড়ো করে বা দায়সারা খসড়ার মাধ্যমে পাস না করার জন্য সরকারকে সতর্ক করেন তিনি। বিলটি আরও নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন রুমিন ফারহানা।

 

 

তার বক্তব্যে তিনি বলেন, খসড়ায় আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গুমকে সুস্পষ্টভাবে চলমান বা অবিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ফলে অতীতে যারা গুমের শিকার হয়েছেন এবং এখনো যাদের সন্ধান মেলেনি, তাদের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির তামাদি ও ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। অতীতে সংঘটিত প্রতিটি গুমের বিচারের পথ আইনগতভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

 

 

প্রমাণের দায় প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, সাধারণত কোনো মামলায় প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব প্রসিকিউশনের ওপর থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত বাহিনী যদি মধ্যরাতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে কাউকে তুলে নিয়ে যায়, তাহলে অসহায় পরিবার বা ভুক্তভোগীরা কীভাবে আদালতের সামনে তাদের মামলা প্রমাণ করবে—সেটি বড় প্রশ্ন।

 

 

আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণ করে কোনো নাগরিককে সর্বশেষ যে বাহিনীর হেফাজতে দেখা গেছে, তিনি তাদের কাছে নেই; এটি প্রমাণের প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর থাকা উচিত বলে মত দেন তিনি।

 

 

তিনি আরও বলেন, বিলে সামরিক ও বেসামরিক বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে স্পষ্ট ও শক্তিশালী বিধান থাকা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বা গোয়েন্দা বাহিনীর কোনো সদস্য গুমের ঘটনায় জড়িত থাকলে বিচার বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

গোপন আটককেন্দ্র নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, কাউকে আটকের সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে মানবাধিকার কমিশন বা আদালত দ্রুত বিষয়টি নজরে নিতে পারবে।

 

 

এ ছাড়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মাসের পর মাস প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সে জন্য অভিযোগ পাওয়ার ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির সনদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।

 

 

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাকে ধন্যবাদ জানান।

 

 

নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ না থাকার বিষয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিলে বলা হয়েছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাইবে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এটিই নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ।

 

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত আগের অধ্যাদেশে ত্রুটি থাকায় সরকার সেটি প্রথম অধিবেশনেই আইনে পরিণত করেনি। বিভিন্ন অংশীজন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক, কূটনৈতিক মিশন ও ইউএনডিপিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা এবং সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে আগের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে বর্তমান বিলটি আনা হয়েছে।

  • শেয়ার করুন