প্রকাশিত: October 2, 2026
পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে বড় ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা হলে দেশটি হাতে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে অবগত থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মস্কোতে অনুষ্ঠিত ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের বার্ষিক সভায় দেয়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট পুতিন এসব কথা বলেন। তবে পুতিন বলেছেন, রাশিয়া ‘কাউকে হুমকি দিচ্ছে না’। পশ্চিমা নেতারা রাশিয়া ২০২৯ বা ২০৩০ সালে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তারই জবাব দিচ্ছে মস্কো।
চলতি সপ্তাহজুড়ে রাশিয়া অভিযোগ করে আসছে, ন্যাটো কালিনিনগ্রাদকে অবরুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী এই ভূখণ্ডকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হলে প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারেরও প্রস্তুতি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে মস্কো।
যদিও পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছে সামরিক জোট ন্যাটো। জোটটি বলেছে, তারা একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। একই সঙ্গে মস্কোকে ‘পারমাণবিক হুমকি’ দেয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বিবিসি বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে পশ্চিমা মিত্রদের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলে এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
শুধু গত সপ্তাহেই পোল্যান্ড জানিয়েছে, কালিনিনগ্রাদের কাছাকাছি তাদের ভূখণ্ডে একটি রুশ হেলিকপ্টার ঢুকে পড়েছিল। আর লিথুয়ানিয়া জানিয়েছে, রাশিয়ার কারণে তাদের জনগণ ‘নিয়মিত হুমকির মধ্যে’ থাকার অনুভূতি পাচ্ছে। এর একটি কারণ হিসেবে দেশটির আকাশসীমায় রুশ ড্রোন প্রবেশের কথা বলা হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস বৃহস্পতিবার বলেন, তার দেশ আরও হাইব্রিড হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে ‘গুরুতর হামলাও’ থাকতে পারে। গত আগস্টে ইউক্রেনের পণ্যবাহী উড়োজাহাজের কাছাকাছি লাইপজিগ বিমানবন্দরের রানওয়েতে বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন পাওয়ার পর তিনি এ কথা বলেন।
এমন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভালদাই বৈদেশিক নীতি ফোরামে দেয়া দীর্ঘ বক্তব্যে পুতিন বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় চলার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ‘পশ্চিমা আধিপত্য’ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি মনে করেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করেছিলেন পুতিন নিজেই। এরপরও তিনি আবারও এই যুদ্ধের জন্য পশ্চিমাদের দায়ী করেন। তার দাবি, রাশিয়াকে উসকানি দেয়া হয়েছিল এবং নিজেদের রক্ষায় মস্কোকে অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
রাশিয়া ইউক্রেনের অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোতে যে হামলা চালাচ্ছে, সেটিও ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগার ও কৃষ্ণসাগরে রুশ জাহাজে হামলার সরাসরি জবাব বলে দাবি করেন পুতিন। তিনি বলেন, ‘এখন চারদিক থেকে আমাদের বলা হচ্ছে, ‘চলুন থামি’। কিন্তু শুরুটা তো তারাই করেছে।’
ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়ে ‘কিছুটা সফল হয়েছে’ বলেও স্বীকার করেন পুতিন। তার দাবি, এসব হামলার কারণে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে হামলা শুরু করার কারণ হলো—এসব স্থাপনা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ক্রেমলিন যুদ্ধের ব্যয় মেটায়।
২০২২ সালে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি শীতেই দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বাড়িয়েছে রাশিয়া। অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোতেও নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছে। বৃহস্পতিবার কিয়েভের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
এমন অবস্থায় পুতিন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি সংঘাত উসকে দেয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘যদি রুশ ফেডারেশনের ওপর সরাসরি হামলা হয়—এ ক্ষেত্রে আমরা কালিনিনগ্রাদের কথা বলছি, তবে অন্য কোনো ভূখণ্ডও হতে পারে— তাহলে রাশিয়ার হাতে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি অবশ্যই এবং তাৎক্ষণিকভাবে সামনে চলে আসবে।’
কালিনিনগ্রাদকে ঘিরে ন্যাটো বাল্টিক সাগরে নৌ মহড়া চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন পুতিন। তার দাবি, এসব মহড়া কালিনিনগ্রাদের জন্য গুরুতর হুমকি। পশ্চিমারা যদি কালিনিনগ্রাদকে অবরুদ্ধ করে, তাহলে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রসহ সব ধরনের শক্তি ও উপায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকবে বলেও জানান তিনি।
পুতিন বলেন, ‘আমরা কাউকে হুমকি দিচ্ছি না। ২০২৯, ২০৩০ বা ২০৫০ সালে আমরা কাউকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছি না। কিন্তু যদি আমরা কোনো আগ্রাসনের মুখে পড়ি, তাহলে আমাদের জবাব দিতেই হবে। ইউরোপের দেশগুলোর নাগরিকদের বিষয়টি পুরোপুরি জানা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি অবগত। তবে রাশিয়ার হাতে থাকা অস্ত্রের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের অস্ত্রের তুলনা হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা, কালিনিনগ্রাদে সরাসরি হামলা না চালিয়ে রাশিয়া মিত্র বেলারুশের সঙ্গে কালিনিনগ্রাদের মধ্যকার ‘সুওয়ালকি গ্যাপ’ নামে পরিচিত সরু স্থলপথ ব্যবহার করে লিথুয়ানিয়ার ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করতে পারে।
গত সপ্তাহে লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, রাশিয়া হামলা চালালে কীভাবে মানুষকে সরিয়ে নেয়া হবে, সে পরিকল্পনা তারা করেছে। দেশটিতে ন্যাটোর হাজার হাজার সেনাও মোতায়েন রয়েছে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে গত বুধবার স্পষ্ট করে বলেছেন, জোটের কোনো ‘মহড়া বা কার্যক্রমই’ মস্কোর জন্য হুমকি নয়। ক্রেমলিনের এমন বক্তব্যকে তিনি ‘একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও সহায়ক নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে পুতিন তার বক্তব্যে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর হাতে থাকা এমন সব অস্ত্র নিয়েও কথা বলেন, যেগুলো ‘পৃথিবীর সব প্রাণ ধ্বংস করে দিতে পারে, অথবা অন্তত পৃথিবীকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে’। এসব অস্ত্র কখনো ব্যবহার করা হবে না—এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি মঞ্চে রাখা বন্দুকের উদাহরণ দেন। তার বক্তব্য, নাটকের শুরুতেই যদি মঞ্চে একটি বন্দুক ঝুলতে দেখা যায়, তাহলে নাটকের শেষদিকে সেটি অবশ্যই ব্যবহার করা হবে। যুদ্ধের নিয়মকানুন নতুন করে নির্ধারণের আহ্বান জানাতেও তাকে বলতে শোনা যায়। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
পুতিন বলেন, ‘যুদ্ধের স্বয়ংক্রিয়ীকরণ ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে যুদ্ধ অনেকটা খেলায় পরিণত হচ্ছে। এর ফলে মানবতা অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে এবং আবারও বর্বরতার দিকে ফিরে যাচ্ছে।’