প্রকাশিত: October 17, 2026
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে (আসন-২৩) ধানের শীষের দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৭০ নারী নেত্রী। এর মধ্যে হেভিওয়েট ও আলোচিত নামই রয়েছে অন্তত এক ডজন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দিনভর চলে মনোনয়ন ফরম বিক্রি। আজ শনিবার জমা দেওয়ার শেষ দিন। এরপর দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, সংসদে যুক্তিতর্ক দিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারবেন এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে যুক্তিসহ খণ্ডন করতে পারবেন—এমন যোগ্য নারী প্রার্থীকে খুঁজছে বিএনপি। বিশেষ করে অযথা কথা বলে সময়ক্ষেপণ এবং বিতর্ক যাতে না হয়, সেদিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। পাশাপাশি অভিজ্ঞ, রাজপথের ত্যাগী এবং বিতর্কমুক্ত ইমেজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
যে কারণে উপনির্বাচন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর আসনটি সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ হিসেবে পরিচিত। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বিএনপির মনোনয়নে এ আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার মিরপুরের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও তার অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ওইদিনই তার আসন (সংরক্ষিত নারী আসন-২৩) শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, এ আসনে উপনির্বাচন হবে আগামী ১২ নভেম্বর। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৬ অক্টোবর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২৭ অক্টোবর। বাছাইয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ২৮ অক্টোবর এবং আপিল নিষ্পত্তি হবে ২৯ অক্টোবর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১ নভেম্বর। পরদিন ২ নভেম্বর প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
১ আসনেই মনোনয়নপ্রত্যাশী ৭০ নারী: ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করার পর শূন্য হওয়া সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনটিতে কে বসছেন—বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এ নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। কেননা, বিগত নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে তৎপর থেকেও অনেকেই সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাননি। কেউ কেউ সরাসরি সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন। এখন তারা মনে করছেন, মিষ্টির পদত্যাগে তাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেত্রীরা। জেলা পর্যায়েরও অনেক নেত্রী এ আসনে দলের মনোনয়ন পেতে তদবির করছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির দিনে ৭০ নারী মনোনয়নপ্রত্যাশী ফরম ক্রয় করেছেন। তবে ৭০ জন ফরম কিনলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছেন বিগত রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোতে ভূমিকা রাখা বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নারী নেত্রীর নাম। তাদের মধ্যে রয়েছেন, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেত্রী, পেশাজীবী ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীও।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দল এখন ক্ষমতায়। ফলে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য হতে আগ্রহীদের সংখ্যাও বেশি হবে, এটা স্বাভাবিক। দলের চেনা নেত্রীদের বাইরেও অনেকে মনোনয়ন পেতে চেষ্টা-তদবির করছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের অফিস, বাসায় দৌড়ঝাঁপ করছেন তারা। এ আসনে দল কাকে বেছে নেবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। তবে এটি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে সাবেক ছাত্রদল নেত্রী, মহিলা দলসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের।
জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরে সংযুক্ত নির্বাহী কমিটির সদস্য তারিকুল আলম তেনজিং কালবেলাকে বলেন, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়েছে। আজ শনিবার সকাল থেকে নির্ধারিত সময়ে ফরম জমা নেওয়া হবে। এরপর দলের সংসদীয় বোর্ডের সভায় যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে দল যাকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করবেন তিনিই মনোনয়ন পাবেন।
আলোচনায় ডজনখানেক নেত্রী: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনে অন্তত ডজনখানেক নেত্রী আলোচনায় রয়েছেন, যাদের সাংগঠনিক ও পেশাগত যোগ্যতা এবং দক্ষতাও রয়েছেন। তারা দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এমন আলোচিত মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, কেন্দ্রীয় গ্রাম সরকারবিষয়ক সহসম্পাদক মৌসুমী নাছরিন, ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সভাপতি রুনা লায়লা, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রেহানা আক্তার শিরিন, দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনা হেনা হীরা, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সিমকী ইমাম খান (সিরাজগঞ্জ), চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সেক্রেটারি জেলী চৌধুরী, বদরুন্নেসা কলেজের প্রথম ভিপি খায়রুন্নাহার খানম মিরু (পাবনা), নিলোফার ইয়াসমিন নিলু, দেওয়ান মাহমুদা আক্তার রিটা ও সৈয়দা আদিবা হোসাইন (সিলেট) অন্যতম। এদের মধ্য থেকেই চূড়ান্ত প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্রগুলো বলছে।
গতকাল সকালে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ। যিনি ছাত্রদলের রাজনীতি থেকেই রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। তিনি গতকাল কালবেলাকে বলেন, আমি ছাত্রজীবন থেকে জাতীয়তাবাদী দলের একজন কর্মী হিসেবে অদ্যাবধি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছি। আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলকে সংগঠিত করার প্রশ্নে সব সময় ভূমিকা রেখেছি। রাজনীতি করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের দমন-নিপীড়ন একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছি। একাধিক বিস্ফোরক মামলার আসামি হয়েছি। ঢাকার রাজপথের পাশাপাশি আমার নির্বাচনি এলাকা বরগুনাতে সব সময়ই জনগণের পাশে থেকেছি। বিগত সংসদ নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলাম। কিন্তু দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তার পক্ষে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেছি। বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্যে ছিলাম অটল। আমার এলাকায় সংসদ সদস্য বিরোধী দলের। আমাকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দিলে আমি এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অন্যতম শাহিনুর নার্গিস কালবেলাকে বলেন, ৩১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদক। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সঙ্গে সব মামলার আসামি হয়েছি। ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ঢাবি ক্যাম্পাসে মামলার ভুক্তভোগী একমাত্র ছাত্রী আমি। বিগত দিনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। জেল-জুলুমসহ নানাভাবে দমন-পীড়ন ও নির্যাতিত হয়েছি। আশা করছি দল মূল্যায়ন করবে।
জানতে চাইলে সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন্নাহার খানম মিরু কালবেলাকে বলেন, আমি ছাত্রজীবন থেকেই দলের প্রতি আনুগত্যশীল। ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজের প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলাম। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। পেশাগত জীবনে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও কাজ করেছি। বর্তমানে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় ইনশাআল্লাহ তার যথাযথ প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করব।
মনোনয়নপ্রত্যাশী রেহানা আক্তার শিরিন কালবেলাকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে দলের আদর্শ ধারণ করে রাজপথের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিগত দিনে দলের প্রতিটি কর্মসূচিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সোচ্চার ছিলাম। দল যদি আমাদের মতো ত্যাগী ও পরীক্ষিত রাজপথের কর্মীদের মূল্যায়ন করে, তবে সংসদ ও সংগঠনের ভেতরে নারী নেতৃত্ব আরও বেশি শক্তিশালী ও গতিশীল হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। দলের হাইকমান্ড সবসময় ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে—এটাই আমার প্রত্যাশা।