প্রকাশিত: October 27, 2026
ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক দল। তাঁর বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বিপজ্জনক বার্তা হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বক্তব্য প্রত্যাহার, সরকারের ব্যাখ্যা এবং আইজিপির জবাবদিহি দাবি করেছে সংগঠনগুলো।
গতকাল সোমবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার, যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে (অনুমতি দেয়), আমরা সেটাই করব।’
দেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অস্ত্রধারী, মাদক ব্যবসায়ী, জলদস্যু কিংবা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে এসব হত্যাকাণ্ডকে কথিত বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব পরিচয়ে অনেক রাজনৈতিক কর্মীকেও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত আরও জোরালো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও ক্রসফায়ার পুরোপুরি বন্ধ করা ও ফৌজদারি কার্যবিধির অপপ্রয়োগ রোধের সুস্পষ্ট তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে কাঠামোগত সংস্কারের ওপরও জোর দেওয়া হয়। এরপরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
আইন ও সালিশ (আসক) কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও হেফাজতে ১৬ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন একজন, গ্রেপ্তারের আগে গুলিতে নিহত চারজন, পুলিশ হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনে ছয়জনের মৃত্যুর অভিযোগ আছে।
টিআইবি বলেছে, আইজিপির বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়। তাঁর বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়াসহ বক্তব্য প্রত্যাহার ও তাঁর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর গতকাল সন্ধ্যায় আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আইজিপি তাঁর বক্তব্যে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি রূপক অর্থে উল্লেখ করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ‘আক্ষরিক’ অর্থে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে সেটি সংশোধন করে ‘রূপক’ অর্থে উল্লেখ করার কথা জানায় পুলিশ সদরদপ্তর।
জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে বলেছে, আইজিপির এমন বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তাঁর অপসারণ চেয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন সমকালকে বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার ক্রসফায়ারকে দুঃশাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এখন আবার সংবিধান ও আইনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ক্রসফায়ার চালু করতে সরকারের কাছে আইজিপি যে প্রার্থনা করেছেন, এটা গণতন্ত্রের দিকে আমাদের যাত্রাকে ভূলুণ্ঠিত করবে। সরকারের উচিত এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া।’
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, আইনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা উচিত। ক্রসফায়ার সম্পূর্ণ বেআইনি। কীভাবে অপরাধ দমন করতে হবে, তার জন্য আইনি কাঠামো রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কোনো বেআইনি কাজে জড়িত হওয়া যাবে না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস সমকালকে বলেন, আইজিপির বক্তব্যে বোঝা যায় ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়। পুলিশ আগেও নিজের সিদ্ধান্তে ক্রসফায়ারে হত্যার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা করত না, গুম করত না। এসব হতো আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে। বর্তমান সরকার পুলিশ কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল এবং গুম প্রতিরোধ আইনকে দুর্বল করে একই বার্তা দিচ্ছে।
সম্প্রতি আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না সরকার। ১৪ সেপ্টেম্বর খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় আইনমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে প্রচলিত আইনকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সুশাসনের পথে যে কোনো অন্তরায় দূর করা হবে।
গুম-খুনের অভিযোগে ক্ষমা চেয়েছিলেন র্যাবের (বর্তমান এসআরবি) সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘র্যাবের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আছে। গুম, খুন, অপহরণ এ রকম অভিযোগ আমাদের বিরুদ্ধে আছে। র্যাব সৃষ্টির পর যেসব জনগণ বা যারা র্যাবের মাধ্যমে নির্যাতিত হয়েছেন তাদের কাছে এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনসহ যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করি। একই সঙ্গে বলতে চাই, এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমেই দায় মুক্ত হতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত ৪০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ১৯ জনকে গুলি, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং সাতজনকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থি সন্ত্রাসীদের খুনোখুনির প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালের মার্চে র্যাব গঠন করা হয়। ওই সময় ঢাকায় পিচ্চি হান্নানসহ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং কথিত চরমপন্থি দমনের নামে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়া হয়।
একই সময়ে পুলিশও ‘ক্রসফায়ার’ শুরু করে। এরপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে ক্রসফায়ার শুরু হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর।
বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে
ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশপ্রধানের বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য মাঠ পর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে বলে মনে করছে টিআইবি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্য রেখে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। তার নেতৃত্বে নাগরিকের জীবন ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, জনগণ সেই আস্থা রাখবে কীভাবে?
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ঘৃণিত ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার পথ খোঁজা কি একই সঙ্গে আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়?’
বিবৃতিতে বলা হয়, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন– এই দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না।
টিআইবি বলছে, পুলিশের পেশাগত শুদ্ধিসহ রাষ্ট্রসংস্কারের প্রত্যাশার পটভূমিতে পুলিশপ্রধান আবার ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন। অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে– এর উত্তর তাকেই দিতে হবে।
আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়াসহ বক্তব্য প্রত্যাহার ও তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে তাঁকে অপসারণের আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
আসকের নিন্দা ও উদ্বেগ
আসক এক বিবৃতিতে বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং আইনের শাসন, সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের মূলনীতির পরিপন্থি। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাঁকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই।
আসক মনে করে, পুলিশের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা। আইন প্রয়োগের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা প্রকাশ করা দায়িত্বশীল আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এ ধরনের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এইচআরএসএসের বিবৃতি
পৃথক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। তারা বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনাকে সরকারি অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত করা আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের জন্য গুরুতর উদ্বেগজনক। অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; তবে তা অবশ্যই আইনসম্মত প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার বিভাগের কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে করতে হবে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে অভিযুক্ত হলেই তাঁর জীবন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার খর্ব করা যায় না।