প্রকাশিত: November 8, 2026
দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে স্বামী-স্ত্রী মিলে গড়ে তুলেছিলেন মাদ্রাসা। স্বপ্ন ছিল, তাদের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে একদিন শত শত হাফেজ ও হাফেজা তৈরি হবে। নিজেরাও হাফেজ ও হাফেজা হওয়ায় সেখানে শিক্ষকতা করতেন দুজন। শিক্ষার্থীদের কোরআন শেখানো আর মাদ্রাসার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের প্রতিদিনের কাজ। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানেই ফিরতে হলো তাদের নিথর দেহ হয়ে। সঙ্গে ফিরেছে মাত্র আট মাস বয়সী শিশুকন্যার মরদেহ। ট্রাকচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন হাফেজ দম্পতি ও তাদের সন্তান। একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও এক মোটরসাইকেলচালক।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের বুরুঙ্গা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের ইন্দুল্লামারী গ্রামের হাফেজ মোরশেদ আলম (২৫), তার স্ত্রী হাফেজা ইকরামা (২৩), তাদের আট মাস বয়সী মেয়ে রিফা ও মোটরসাইকেলচালক লিখন আকন্দ (৪৫)। লিখন মেলান্দহ পৌরসভার শাহজাদপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি বোরকত মেম্বারের ছেলে।
শনিবার দুপুরে মাহমুদপুর এলাকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় মোরশেদ, ইকরামা ও তাদের শিশুকন্যার মরদেহ পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। যে প্রতিষ্ঠানে বসে তারা অসংখ্য হাফেজ ও হাফেজা তৈরির স্বপ্ন দেখতেন, সেই প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় তাদের নিথর দেহ ফিরতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সবাই।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোরশেদ আলমের বাড়ি ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের ইন্দুল্লামারী গ্রামে। ইকরামাকে বিয়ের পর থেকে তিনি শ্বশুরের প্রতিষ্ঠিত কমপ্লেক্সে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। সেখানেই স্বামী-স্ত্রী দুজন শিক্ষকতা করতেন।
মোরশেদ ও ইকরামা দুজনই পবিত্র কোরআনের হাফেজ ও হাফেজা ছিলেন। দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে তারা যৌথভাবে ২০২৫ সালে মাহমুদপুর এলাকায় ‘হারুনুর রশিদ ইসলামী কমপ্লেক্স’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের স্বপ্ন ছিল, এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কোরআন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে একদিন অসংখ্য হাফেজ ও হাফেজা গড়ে তুলবেন। সেই লক্ষ্যেই দুজন মিলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা ও শিক্ষকতা করতেন।
শুক্রবার রাতে জামালপুর শহরের শেখেরভিটা এলাকায় একটি ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়েছিলেন তারা। পরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাত কাটান। শনিবার সকালে আট মাস বয়সী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ইজিবাইকে করে নিজেদের মাদ্রাসায় ফিরছিলেন। পথে বুরুঙ্গা এলাকায় পৌঁছালে দুর্ঘটনার শিকার হন তারা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে দেওয়ানগঞ্জ থেকে একটি ট্রাক জামালপুরের দিকে যাচ্ছিল। বুরুঙ্গা এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে ট্রাকটির সংঘর্ষ হয়। এরপর ট্রাকটি একটি ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ইজিবাইকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকে থাকা মোরশেদ, তার স্ত্রী ইকরামা ও তাদের শিশুকন্যা রিফার মৃত্যু হয়।
গুরুতর আহত মোটরসাইকেলচালক লিখন আকন্দকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ট্রাক নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন চালক। পরে স্থানীয় লোকজন মেলান্দহের মালঞ্চ এলাকায় ট্রাকটি আটক করেন। তবে চালক পালিয়ে যান। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার চালকের নাম শান্ত (২০)। তিনি জামালপুর সদর উপজেলার তিতপল্লা এলাকার বাসিন্দা। তাকে মেলান্দহ থানায় রাখা হয়েছে।
মাদারগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান ভূঞা বলেন, মেলান্দহে সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে এবং চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। তিনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, একই পরিবারের তিনজনসহ চারজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিশেষ করে আট মাসের শিশুটির মৃত্যুর ঘটনা মেনে নেওয়া কঠিন। আমি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা হবে।