ইরানের মুদ্রার নতুন রেকর্ড পতন, ডলার ১৪ লাখ ৭০ হাজার রিয়াল

প্রকাশিত: January 9, 2026

  • শেয়ার করুন

ইরানের মুদ্রা রিয়াল নতুন করে বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে। মঙ্গলবার অনানুষ্ঠানিক বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার রিয়াল, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন। ইউরোর দাম উঠেছে প্রায় ১৭ লাখ ২০ হাজার রিয়াল এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের দর পৌঁছেছে প্রায় ১৯ লাখ ৯৪ হাজার রিয়ালে।

ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে রিয়ালের দামে তীব্র ওঠানামা চলছে। মুদ্রার এই পতনই তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে চলমান বিক্ষোভের একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে।

সরকার মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে কিছু নতুন পদক্ষেপের কথা বলেছে। এর মধ্যে ভর্তুকিযুক্ত বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে, যা এতদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে ব্যবহৃত হতো। সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থায় বাজারে বিকৃতি তৈরি হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কার্যকর হয়নি। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার এখন সরাসরি পরিবারভিত্তিক সহায়তার দিকে যেতে চায়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য মাসিক ইলেকট্রনিক ভাউচার বা কুপন চালু করা।

দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় অনেক মানুষ সঞ্চয়ের জন্য ডলার ও সোনার দিকে ঝুঁকছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় আবারও দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।

চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই অর্থনৈতিক সূচকগুলো সরকারের সক্ষমতা ও জনগণের আস্থার বড় মাপকাঠি হয়ে উঠছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আগামী অর্থবছরের খসড়া বাজেটে, যা ২২ মার্চ থেকে কার্যকর হবে।

খসড়া বাজেট অনুযায়ী, সরকার তেল রপ্তানি থেকে প্রায় ১৮৫০ ট্রিলিয়ন রিয়াল আয় ধরেছে, যা সরকারি বিনিময় হারে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সমান। অন্যদিকে সামরিক ও নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের অন্তত ১৬ শতাংশ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ ধরা হয়েছে সরকারের তেল আয়ের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। একই সঙ্গে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ৬৩ শতাংশ, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান তেল রপ্তানি থেকে প্রায় ১৯৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০১০ সালে যেখানে জিডিপি ছিল প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে আনুমানিক ৩৫৬ বিলিয়ন ডলারে।

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে তেল, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি থেকে দেশটি আয় করেছে প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অথচ নতুন বাজেটে সরকারের মোট আয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

এই চিত্র দেখাচ্ছে, ইরানের অর্থনীতিতে সম্পদের ঘাটতি নেই, বরং বড় প্রশ্ন হলো এসব সম্পদ কীভাবে বণ্টন ও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেই অর্থনৈতিক সংকট কাটবে এমন নয়। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সঠিক ব্যয়নীতি।

বিক্ষোভ চলতে থাকা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকলেও আগামী দিনে ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অর্থনীতির ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র-ইরান ইন্টারন্যাশনাল

  • শেয়ার করুন