ফেসবুকে পরিচয়, প্রেমিকার ডাকে দেখা করতে গিয়ে প্রেমিক খুন

প্রকাশিত: August 15, 2026

  • শেয়ার করুন

ঢাকা প্রতিনিধি: ফেসবুকে পরিচয় থেকে প্রেমের সম্পর্ক। পরে আদান-প্রদান হয় ব্যক্তিগত ছবি। একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পারেন প্রেমিকার স্বামী। এরপর পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রেমিককে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর বছিলার একটি ফাঁকা মেসে ডেকে নিয়ে সাজ্জাদ হোসেন (২৪) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশ ৯ টুকরা করে তিনটি কার্টনে ভরে ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়।

নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উল্লেখ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলায় অভিযুক্ত সুমাইয়া তৃষ্ণা (২৬) ও তার স্বামী রোকনুজ্জামান পলাশ (২৬) বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমও চলছে।

ফেসবুক থেকে প্রেমের সম্পর্ক

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সাজ্জাদের সঙ্গে সুমাইয়া তৃষ্ণার পরিচয় হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই মাস আগে তাদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়। একপর্যায়ে সম্পর্কটি প্রেম ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় গড়ায়।

তদন্তে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদানও হয়। বিষয়টি জানতে পারেন সুমাইয়ার স্বামী রোকনুজ্জামান। এরপর দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে সাজ্জাদকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

বছিলার মেসে ডেকে নিয়ে হত্যা

পিবিআইয়ের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল সকালে সাজ্জাদকে বছিলার একটি মেসে ডেকে নেন সুমাইয়া। ওই মেসে আগে থেকেই লুকিয়ে ছিলেন তার স্বামী রোকনুজ্জামান।

সাজ্জাদ মেসে পৌঁছানোর পর সুমাইয়ার সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে রোকনুজ্জামান আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ছুরি দিয়ে তার মুখ ও পিঠে আঘাত করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সাজ্জাদ নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রোকনুজ্জামান দাবি করেন, সাজ্জাদের মৃত্যুর পর কক্ষের মেঝে রক্তে ভেসে যায়। এরপর লাশ সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে তারা লাশ টুকরা করার সিদ্ধান্ত নেন।

লাশ ৯ টুকরা করে তিন কার্টনে

তদন্তে উঠে এসেছে, লাশ গুম করার জন্য চালের বস্তা, চটের ব্যাগ, বড় কার্টন ও স্কচটেপ কেনা হয়। পরে লাশের খণ্ডিত অংশ তিনটি কার্টনে ভরে সেগুলো শক্তভাবে প্যাকেট করা হয়।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এরপর প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করেন রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া। রাতের দিকে কার্টনগুলো নিয়ে তারা বছিলা থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া এলাকার দিকে রওনা হন।

একটি কার্টন মুন্সিগঞ্জের পদ্মা সেতু (উত্তর) থানার মেদিনীমণ্ডল এলাকায় একটি নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। অন্য দুটি কার্টন কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের পাওয়ার হাউস থেকে মালঞ্চ হাসপাতাল সড়কের পাশের একটি নিচু ও নির্জন জায়গায় ফেলে রেখে চলে যান তারা।

কুকুরের টানেই বেরিয়ে আসে লাশ

২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে ফেলে যাওয়া একটি কার্টন থেকে একটি কুকুর পোঁটলা টেনে বের করে ছিঁড়ে ফেললে সাজ্জাদের লাশের খণ্ডিত অংশ বেরিয়ে আসে।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের অংশগুলো উদ্ধার করে। প্রায় একই সময়ে মুন্সিগঞ্জ থেকেও আরেকটি কার্টন উদ্ধার করা হয়।

পরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের খণ্ডিত অংশ পাঠানো হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্টের পাশাপাশি হাড়, দাঁত ও নখের নমুনা সংগ্রহ করে পিবিআই। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, উদ্ধার হওয়া অংশগুলো সাজ্জাদ হোসেনের।

প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত খুনিরা

শুরুতে পুরো ঘটনাটিকে ‘ক্লুলেস’ হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। মুঠোফোনের কল রেকর্ড, অবস্থান ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের সূত্র পাওয়া যায়।

তদন্তে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের আগে রোকনুজ্জামান এক রিকশাচালকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে একটি সিম সংগ্রহ করেছিলেন। ওই সিম ব্যবহার করেই সাজ্জাদকে বছিলার মেসে আসতে ফোন করা হয়।

পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ।

ভারতে পালানোর পরিকল্পনাও ছিল

হত্যাকাণ্ডের পর রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়া ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। রোকনুজ্জামানের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে হওয়ায় তারা ওই সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে সুমাইয়া তার ব্যবহৃত সিম ফেনীতে গ্রামের বাড়িতে রেখে গাবতলী হয়ে জীবননগরের দিকে রওনা হন। প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ। পরে বাসে যাত্রীবেশে পুলিশ সদস্য গিয়ে জীবননগরে পৌঁছানোর পর ৮ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে সুমাইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গ্রেপ্তার করা হয় রোকনুজ্জামানকেও।

মামলা এখন সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে

ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল রাতে সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। পরে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের পর সেটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর রোকনুজ্জামান ও সুমাইয়ার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পিবিআই। অভিযোগপত্রে ৪০ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, “আমার ছেলে খুব ভালো ছিল। ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।”

  • শেয়ার করুন