‘আমার ছেলেরে ওরা মেরে ফেলল ভাই’

প্রকাশিত: October 4, 2026

  • শেয়ার করুন

‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না’- এভাবেই একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন বাবা মৃদুল ইসলাম। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪ বছর ৬ মাস বয়সী শিশু আভানের মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও অবহেলার অভিযোগ তুলেছে পরিবার।

মৃত শিশু আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন আর কিছু লাগবে না। আমার বাচ্চাটা; শোনেন, বিশ্বাস করেন- আমি চাকরি করি না বাচ্চাকে স্কুলে দিব বলে। আমি ছোট ছোট কাজ করি। আমার বাচ্চা ফেরত দেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী প্ল্যান করেছি- আর বাচ্চা নিব না। নয়তো আভানের ভালোবাসা কম হবে। ওকে কারও কাছে দেই না। ওকে আমি বাইকে নিয়ে ঘুরি। সে একটা রেড কার কিনবে বলেছে- আমি টাকাও জমা দিয়েছি।’

সন্তান হারানোর শোকে বারবার বিলাপ করে মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই…। সে নাই আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাকে মেরে ফেলেন। বিশ্বাস করেন আমার ছেলে হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। তাকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে ওরা মেরে ফেলেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা কিছু আমাকে বলবে না। তিন দিন ওয়ার্ডে; সে খাচ্ছে। বাসা থেকে চিকেন নিয়ে আসছে সেমাই নিয়ে আসছে, ভিডিও আছে আমাদের কাছে। সে খাচ্ছে আর আমাকে কাছে বলছে- বাবা তুমি চলে আসো, আমি এখানে থাকব না।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ওরা ভাই ক্যানোলা করতে পারে না। উনাদের কথা কেউ একজন যদি ভালো বলে আমি এখান থেকে নাকে খত দিয়ে চলে যাব।’

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে শিশু আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকরা শিশুটিকে ডেঙ্গু রোগী হিসেবে সন্দেহ করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যান। অথচ হাসপাতালে করানো একাধিক মেডিকেল পরীক্ষায় বারবারই ডেঙ্গু রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ আসে। নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পরও ভুল লাইন ধরে চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয় বলে দাবি পরিবারের।

গত ২ অক্টোবর কোনো সুস্পষ্ট বা যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা না করেই শিশুটিকে হঠাৎ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ, আইসিইউতে নেওয়ার পরও সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি মূলত টেলিফোনের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং সেভাবেই শিশুটির চিকিৎসা চলছিল। ফলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার শিশুটির অবস্থা উন্নতির দিকে বলে মিথ্যা আশ্বাস দিলেও শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে শিশুটি মারা যায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসাধীন শিশুটিকে অতিরিক্ত মাত্রার (ওভারডোজ) অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়েছিল। এর ফলেই সে মারাত্মক ‘শক সিনড্রোম’-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বলে দাবি স্বজনদের।

নিজেদের ভুলের দায় এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিকেল রিপোর্টগুলো পরিবারের কাছে দিতে অস্বীকৃতি জানায় বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। পরে স্বজনরা চাপ প্রয়োগ করে রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করেন।

সেই মেডিকেল নথিপত্রে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিনড্রোমের তথ্য উঠে আসে, যা পরিবারের ভুল চিকিৎসার সন্দেহের ভিত্তিকেই জোরালো করছে বলে দাবি স্বজনদের।

রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ও অতিরিক্ত মাত্রার (ওভারডোজ) অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে ৪ বছর ৬ মাস বয়সী শিশু আভানের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। মৃত শিশুটির বাবা মৃদুল ইসলাম পেশায় একজন গণমাধ্যমকর্মী।

স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সরাসরি অনুপস্থিতি এবং চরম অবহেলার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবার।

হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে স্বজনরা এরই মধ্যে তাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এই অপচিকিৎসা ও অবহেলার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন শোকাহত স্বজনরা।

  • শেয়ার করুন