৭০ বছর পর চালু হল আসাম থেকে বাংলাদেশে নৌপথে পণ্য পরিবহন

প্রকাশিত: October 6, 2026

  • শেয়ার করুন

প্রায় ৭০ বছর পর ভারতের আসাম রাজ্যের ডিব্রুগড় থেকে আবারও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য শুরু হয়েছে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বগীবিল টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানলবাহী একটি বার্জের যাত্রা উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় জাহাজ চলাচলমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। স্বাধীনতার পর আসাম থেকে কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে এটিই প্রথম পণ্য চালান।

নামরুপে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডে উৎপাদিত মিথানল ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে ভারতের জাতীয় জলপথ-২ ব্যবহার করে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল নৌপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বগীবিল থেকে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ প্রায় এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

এই চালানকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বিদেশি বাজারের যোগাযোগ বাড়াতে ব্রহ্মপুত্র নদকে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের পথে ব্যবহারের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

বগীবিল ও ধুবড়িতে সম্প্রতি শুল্ক ও অভিবাসনসংক্রান্ত সুবিধা চালু হওয়ায় এই নৌপথে পণ্য পরিবহন সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ডিব্রুগড়ের নদীবাণিজ্যও পুনরুজ্জীবিত হলো। শহরটির ঐতিহাসিক নৌবন্দর ১৯৫৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় চা পরিবহন নদীপথ থেকে রেলপথে চলে যাওয়ায় ডিব্রুগড় থেকে নিয়মিত নদীপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়।

সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ডিব্রুগড় ঘাটে একসময় স্টিমারের বাঁশির শব্দ শোনা যেত। প্রায় ৭০ বছর সেই শব্দ বন্ধ ছিল। এখন আবার ডিব্রুগড় থেকে বাণিজ্যের উদ্দেশে জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। নদীপথকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয় সদিচ্ছার অভাবই এতদিন এই যোগাযোগব্যবস্থার বড় বাধা ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের জাহাজটি ‘কুশল কোঁওর’ নামের টাগবোটের সাহায্যে পণ্য নিয়ে বাংলাদেশের পানগাঁও বন্দরে যাবে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি এই যাত্রা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।

হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গণমাধ্যমকে বলেন, নামরুপে উৎপাদিত আসামের নিজস্ব পণ্য এখন আসামের নিজস্ব নদীপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল আর ভারতের প্রান্তিক অঞ্চল নয়, বরং এটি পূর্বাঞ্চলের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডিব্রুগড়ের নদীপথ যোগাযোগ পুনরুজ্জীবনে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে টার্মিনালটি চালু হয়। পাশাপাশি শুল্ক ও অভিবাসনসংক্রান্ত অবকাঠামো এবং জলপথে পণ্য পরিবহনে প্রণোদনা কর্মসূচিও এই যোগাযোগব্যবস্থাকে সহায়তা করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই নদীপথে নৌযান চলাচল হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাটা স্টিলের একটি বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ নামের নদীভ্রমণ জাহাজ বাংলাদেশ হয়ে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যাত্রা করে।

পণ্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অভ্যন্তরীণ জলপথের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। দেশটির বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের জলপথ উন্নয়নে ছয় হাজার ৮০০ কোটি রুপির বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামতের সুবিধা তৈরি এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে শেষ ধাপের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ রয়েছে।

সোনোয়াল বলেন, নদীপথে পণ্য পরিবহনের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে। নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনের ফলে কম জ্বালানি ব্যবহার হয় এবং মহাসড়কে ট্রাক চলাচলও কমে।

আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভারত বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করছে। ডিব্রুগড় থেকে ঢাকায় এই পণ্য পরিবহন উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য আরও একটি নতুন পথ খুলে দিতে পারে।

  • শেয়ার করুন