প্রকাশিত: October 5, 2026
মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ফেলে যাওয়া জমিতে বন্দিশিবির, সামরিক ব্যারাক ও বসতি নির্মাণ করছে আরাকান আর্মি (এএ)। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে স্যাটেলাইট চিত্র, জাতিসংঘের গবেষণা ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে রাখাইনের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস করে তাদের জমি দখলে নিচ্ছে আরাকান আর্মি। উত্তর রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অন্তত ১০টি শিবির নির্মাণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন বুথিডং টাউনশিপের হ্নগেট থায় এলাকায় এমন একটি শিবিরের তথ্য পেয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ওই এলাকায় রোহিঙ্গারা ধান চাষ করতেন। তবে ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে প্রায় ১২০টি ধূসর রঙের ভবন দেখা গেছে। এগুলো আরাকান আর্মি পরিচালিত বন্দিশিবিরের স্থাপনা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে রাখা হয়েছে এবং অনুমতি ছাড়া তাদের শিবিরের বাইরে যাওয়া বা সেখানে প্রবেশের সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর জমি দখল করে সেখানে শিবির, বসতি ও সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। একই সময়ে রোহিঙ্গাদের জমি দখল ও তাদের বাস্তুচ্যুত করার অন্তত ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ।

রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার পাশাপাশি বাড়ির কাঠ ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে আরাকান আর্মির জন্য স্থাপনা নির্মাণে বাধ্য করা হয়েছে। ওয়েত নিয়ো তাউং এলাকায় ‘এপি ব্যাটালিয়ন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক ব্যারাক নির্মাণের কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদিকের অভিযোগ, তাদের কৃষিজমি ও ফলের বাগান পরিষ্কার করে সেখানে নতুন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। আরেক রোহিঙ্গা জানান, তাদের দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার, পরিখা খনন ও শিবিরের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের কায়িক শ্রম করানো হতো।
রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক শ্রম, জোর করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ এবং কর আদায়ের অভিযোগও রয়েছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। তবে আরাকান আর্মি এসব যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা শুধু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।
জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার পরিকল্পনাকারীদের লক্ষ্য ছিল ‘মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা তৈরি করা’।
তবে রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংসের জন্য আরাকান আর্মিই দায়ী—এমন তথ্য এখনও জাতিসংঘের তদন্তে নিশ্চিত হয়নি বলেও জানান তিনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক টম ড্যানেনবামের মতে, রোহিঙ্গাদের ওপর জবরদস্তি এবং তাদের নিজ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার সমন্বিত কর্মকাণ্ড ‘জনসংখ্যা স্থানান্তর’-সংক্রান্ত যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরগুলোতে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
এ দিকে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা চলছে। চলতি মাসেই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আদালতের রায় দেয়ার কথা রয়েছে।