প্রকাশিত: October 26, 2026
খুলনায় আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা। প্রতিপক্ষকে হত্যা, গুলি করে জখম, প্রকাশ্যে অপহরণ, ক্লিনিক ভাঙচুর, গুলি করে ভয় দেখানো এবং হুমকির ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রতিটি অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে নগরীতে সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর নাম আসছে। অধিকাংশ ঘটনার মূল হোতারা ধরা পড়ছে না। যার কারণে অপরাধও কমছে না। এসব নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নগরীর মানুষ। আতঙ্কের কারণে মামলাও করতে চাইছেন না ভুক্তভোগীরা।
খুলনা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার সন্ত্রাসীরা দ্রুত জামিন পেয়ে বের হয়ে আসছে। সহজে জামিন পাওয়ায় তারা আরও নির্ভয় করে তুলছে। এ ছাড়া অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরে ভুক্তভোগীরা মামলা ও সহযোগিতা করে না। যার কারণে অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে বেগ পেতে হচ্ছে।
খুলনার অপরাধ জগৎ সম্পর্কে খোঁজ রাখেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন দুজন কর্মকর্তা জানান, গত এক বছরে তালিকাভুক্ত ৩৮ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এর মধ্যে শেখ পলাশ ছাড়া অধিকাংশই জামিনে বের হয়ে এসেছে। তারা সবাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বেই খুন হচ্ছে বেশি। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের পরপরই জামিন পাওয়ায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। নতুন করে গ্রেপ্তারের তৎপরতা কমে যাচ্ছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে খুলনা মহানগরীতে ৩৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। গুলি করে জখম করার ঘটনা ঘটেছে অর্ধশত।
অপরাধীরা ধরা পড়ছে না
গত ২২ অক্টোবর ভোরে নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত জুনে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন তিনি। সম্প্রতি জামিনে বের হলেও এলাকায় থাকতেন না।
এ ঘটনায় পুলিশের এসআই শাহ আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে শহিদুল ইসলাম সেজান, সাকিবুর রহমান জিতু ও রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। গত চার দিনেও এই মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। নিহত তুষার শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিল। অন্যদিকে সেজান ও জিতু সন্ত্রাসী গ্রুপ বি কোম্পানির সদস্য।
একই দিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় খুশি আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূকে। এ ঘটনায় নিহতের বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিক, মিরাজ খানসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায়ও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
গত শনিবার রাতে নগরীর টুটপাড়া গাছতলা মন্দিরের সামনে রূপসা কলেজের প্রভাষক আকাশ কুণ্ডুকে (৪৫) গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ওই এলাকায় তাঁর একটি মুদি দোকান ছিল। বেশ কিছু দিন আগে ওই দোকানে চাঁদা দাবি করেছিল সন্ত্রাসীরা।
জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশের সদর জোনের সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে হত্যাকাণ্ড দুটি সংঘটিত হয়। আর আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করা হয়েছে চাঁদা না দেওয়ায়। তিনটি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ক্লিনিকে ভাঙচুর, সশস্ত্র মহড়া
গত শনিবার রাতে খুলনা নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তারা ক্লিনিকের বাইরে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ ঘটনায় ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা আহত হন। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এক কর্মীর মোবাইল ফোন।
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত সন্ধানী খুলনার পুরাতন এবং ব্যবসাসফল ক্লিনিকগুলোর মধ্যে অন্যতম। ৪০ শয্যার হাসপাতাল ছাড়াও প্যাথলজি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে সেখানে ৪৩ জন চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। ক্লিনিকে কাজ করেন ১৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। শনিবার রাতে ক্লিনিকে দুই শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সবার সামনেই ৮-১০ যুবক মুখে মাস্ক পরে ক্লিনিকে ভাঙচুর শুরু করে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল রোববার সকালে ক্লিনিকে গিয়ে বহির্বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ দেখা গেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্লিনিকটি পরিদর্শন করেন। ক্লিনিকের মালিক জোহরা বাকের, তাঁর দুই ছেলে ডা. নাইম বাকের ও আরমান বাকের কেউই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাননি।
ক্লিনিকের ব্যবস্থাপক মহিদুল ইসলাম রাজু বলেন, কেন হামলা হয়েছে জানি না। কেউ চাঁদা চেয়েছিল বলেও শুনিনি।
তবে স্থানীয়রা জানান, ক্লিনিকের আশপাশে বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট ব্যাচ রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে ফাকাব্বির সীন নামে এক সন্ত্রাসী কোচিং সেন্টারগুলোতে চাঁদা দাবি করে আসছিল। এক কোচিং সেন্টারের মালিক চাঁদা পরিশোধ করায় সন্ত্রাসীদের আরেকটি গ্রুপ তাঁর কাছে পাল্টা চাঁদা চায়। চাঁদা না দিলে কোচিং সেন্টারে গুলি করার হুমকি দিয়েছিল।
খুলনা সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন জানান, ভাঙচুরের ঘটনায় মোস্তফা আলম হিরা ও মারুফ নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ভাঙচুরে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, ফাহিম নামে একজন তাদের ডেকে নিয়ে যায়। ফাহিমকে খুঁজছে পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিরা সন্ত্রাসী গ্রুপ বি কোম্পানির সদস্য।
এ ছাড়া গতকাল দুপুরে নগরীর মজিদ সরণিতে অবস্থিত সন্ধানী ক্লিনিকের আরেক শাখায় সশস্ত্র মহড়া দিয়েছে বেশ কয়েকজন যুবক। হাসপাতালের চিকিৎসক পার্থ সাহা বলেন, দুপুরে ৮-১০ যুবক ক্লিনিকে প্রবেশ করে ম্যানেজারকে খুঁজতে থাকে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল। ম্যানেজারকে না পেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছে ‘ভালো হয়ে যা’।
নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, সংবাদ পেয়ে ওই ক্লিনিকে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এর আগেই দুর্বৃত্তরা চলে যায়। সিসি ক্যামেরা থেকে তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
মামলা করছেন না ভুক্তভোগীরা
গত ৭ অক্টোবর দুপুরে নগরীর কে ডি ঘোষ রোড থেকে সদর সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে তুলে নিয়ে যায় একদল যুবক। পুলিশ তৎপর হয়ে উঠলে ৪০ মিনিট পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জড়িতরা সবাই সন্ত্রাসী গ্রুপ বি কোম্পানির সদস্য। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী থানায় কোনো মামলা করেননি। অপহরণে জড়িত লাল মিয়া নামের এক সন্ত্রাসীকে আটক করে পুলিশ। ভুক্তভোগী মামলা না করায় তাঁকে অন্য মামলায় চালান দেওয়া হয়। ১২ দিনের মধ্যে তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন।
গত ২২ অক্টোবর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তাওহিদুল ইসলাম তুষার হত্যার ঘটনায়ও মামলা করেনি পরিবার। মামলা করেননি চাঁদা না দেওয়ায় গুলির শিকার প্রভাষক আকাশ কুণ্ডুও। ক্লিনিকে ভাঙচুরের ঘটনায়ও কোনো মামলা হয়নি।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীরা মামলা ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দ্রুত জামিন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এই দুই কারণে খুলনার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।