প্রকাশিত: November 2, 2026
প্রকাশিত:
খুলনা:
খুলনায় দলিল লেখক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা খান মো. জাকির হোসেন হত্যা মামলায় দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। একই সঙ্গে মামলাটি বিচারের জন্য অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (দ্বিতীয়) আদালতে বদলি করা হয়েছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
প্রায় ১৪ বছর আগে খুলনার ডিসি ও এসপি অফিসের কাছের কেসিসি মার্কেটে গুলি করে হত্যা করা হয় বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব খান মো. জাকির হোসেনকে। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত দুই আসামি হলেন বাহাউদ্দিন খন্দকার ও সাদিকুর রহমান রনি।
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী চার্জশিটভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ শুরুর আবেদন জানান। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মহানগর দায়রা জজ মো. মহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ (দ্বিতীয়) আদালতে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ কে এম শহিদুল আলম জানান, জাকির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটির ওপরও শুনানি হয়েছে। মামলাটি আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে। শুনানির সময় দুই আসামিই আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. ইকবাল হোসেনের দাখিল করা অভিযোগপত্রে বাহাউদ্দিন খন্দকারকে হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং সাদিকুর রহমান রনিকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত বলে অভিযুক্ত জামাল, যিনি সাবেক কাউন্সিলর কালামের ভাই, মারা গেছেন।
অভিযোগপত্রে বাহাউদ্দিন খন্দকারের রাজনৈতিক পরিচয় ও অন্যান্য মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া হরিণটানা থানায় মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ হত্যা মামলা এবং খালিশপুর থানায় বিএনপি কার্যালয়ে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মামলায় তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সাদিকুর রহমান রনি আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাহাউদ্দিনের অধীনে কাজ করার কথা উল্লেখ করেন। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, দলিল সম্পাদন নিয়ে জাকিরের সঙ্গে জামালের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ওই বিরোধের জেরে বাহাউদ্দিন ও জামাল জাকিরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। পরিকল্পনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি করেন।
জবানবন্দিতে রনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ও বাহাউদ্দিন ঢাকায় যান এবং হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২২ সালে রিট খারিজ হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। পরে পুলিশ তাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২০ মে সন্ধ্যায় কেসিসি মার্কেটে নিজের চেম্বারের সামনে থাকা অবস্থায় আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন খান মো. জাকির হোসেন। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী মোসা. জামিলা বেগম অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে খুলনা সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ সময় থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), সিআইডি ও পিবিআই মামলাটি তদন্ত করে। পরে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. ইকবাল হোসেন দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হত্যার পরিকল্পনার পর বাহাউদ্দিন খন্দকার ২০১২ সালের ১৮ মে নেপাল যান। এদিকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জামাল ও সাদিকুর রহমান রনি মাঠে নামেন। ২০ মে সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে করে তারা কেসিসি মার্কেটে পৌঁছান। সেখানে চেম্বারের সামনে থাকা জাকিরকে লক্ষ্য করে জামাল গুলি করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। গুলিটি তাঁর পেটের সামনে দিয়ে ঢুকে পিঠের বাম পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তারা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সম্পত্তি উদ্ধার, দলিল সম্পাদন নিয়ে বিরোধ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত শত্রুতাসহ একাধিক বিষয়কে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তদন্তে উঠে এসেছে। পিবিআই তদন্ত শুরুর দিকে অভিযুক্ত শ্যুটার জামালের মৃত্যু হওয়ায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।