পিছু ছাড়ছে না অপরাধীর তকমা, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই সুন্দরবনের সাবেক জলদস্যুদের

প্রকাশিত: November 8, 2026

  • শেয়ার করুন

একসময় যাদের হাতে থাকত অস্ত্র, যাদের ভয়ে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার সাহস পেতেন না জেলেরা, তাদের অনেকেই ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। তবে এখনও পুরোপুরি দস্যুমুক্ত হয়নি সুন্দরবন। সম্প্রতি সুন্দরবন রিজিয়ন-৬-এর (এসআরবি-৬) কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন ৭৪ জন জলদস্যু। অস্ত্র ছেড়ে তারা হাতে তুলে নিয়েছেন মাছ ধরার জাল। জীবিকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন নদী ও বনের কঠিন জীবন। কিন্তু অপরাধের অতীত পেছনে ফেলে নতুন করে বেঁচে থাকা কতটা সহজ? পরিবার, সমাজ ও জীবিকার সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াইয়ে কেমন আছেন আত্মসমর্পণ করা সাবেক জলদস্যুরা?

সুন্দরবনের অন্যতম জলদস্যু বাহিনী দুলাভাই বাহিনীর প্রধান আফজাল হোসেন। ২০১৮ সালে দস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও ফিরে যান অপরাধজগতে। তার দাবি, অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলেও সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে আবারও জড়িয়ে পড়েন দস্যুতায়। তবে সম্প্রতি নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।

আফজাল হোসেন বলেন, কেউ একবার খারাপ পথে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসার পর যদি কেউ তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন, ‘ভাই, ফিরে এসেছিস, খুব ভালো কাজ করেছিস। আয়, আমার বুকে আয়।’ তাহলে হয়তো নতুন করে বাঁচার সাহস মেলে; কিন্তু কেউ এমন কথা বলেন না। বরং সবাই আবারও অপরাধের অন্ধকারে ঠেলে দেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ধরতে যাওয়া মানেই ছিল অনিশ্চয়তা। কখনো জলদস্যুদের কবলে পড়ার ভয়, কখনো মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, আবার কখনো সর্বস্ব হারানোর আতঙ্ক। পুরো সুন্দরবনজুড়েই ছিল জলদস্যুদের দাপট।

সুন্দরবনের নদীগুলোই একসময় ছিল তাদের অপরাধজগতের অংশ। তবে ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। ওই সময় আত্মসমর্পণ করেন বহু জলদস্যু। কিন্তু কিছুদিন পর তাদের অনেকেই আবারও জড়িয়ে পড়েন দস্যুতায়।

তবে এখন আবার অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকে। কিন্তু অতীত থেকে মুক্ত হয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। তাদের এই প্রত্যাবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকর পুনর্বাসনের ওপর।

সম্প্রতি আত্মসমর্পণ করা সাবেক কয়েকজন জলদস্যুর সঙ্গে কথা হয় সময় সংবাদের। তাদের প্রত্যেকের গল্প প্রায় একই। অস্ত্রের জীবন ছেড়ে মাছ ধরার জালে ফিরেছেন তারা। পরিবার নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু এলাকায় ফিরেও কাটছে না অপরাধীর তকমা। মানুষের অবিশ্বাস, সামাজিক দূরত্ব ও জীবিকার অনিশ্চয়তায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।

এক সাবেক জলদস্যু বলেন, আগে প্রশাসনকে ঘৃণা করতাম। কিন্তু গত দুই মাসে প্রশাসনের সদস্যদের আচরণে আমার ধারণা বদলেছে। এ সময়ে তারা আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, কেউ বিরক্ত করেননি। ফলে এখন শান্তিতে খাওয়া-ঘুমাতে পারছি।

আরেক সাবেক জলদস্যু বলেন, আগে সব সময় ভয় কাজ করত; কখন অন্য কোনো বাহিনী এসে গুলি করে, কখন প্রশাসন, কোস্টগার্ড, র‍্যাব বা পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়। পানিতে নামলে কুমিরের ভয়, বাঘের ভয়-সব মিলিয়ে এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হতো। তবে এখন নতুন জীবন পেয়ে ভালো আছি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও অশান্ত হয়ে ওঠে সুন্দরবন। তবে গত দুই মাসে এসআরবি-৬-এর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে সুন্দরবনের কয়েকটি বাহিনীর ৭৪ জন জলদস্যু। এবারের আত্মসমর্পণ যেন আগের মতো ব্যর্থ না হয়, সে জন্য তাদের সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সুন্দরবনের প্রায় ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য এসআরবি-৬ খুলনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এসময় ৭৩টি অস্ত্র, ৮৫২ রাউন্ড গুলি এবং দস্যুতায় ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীরা ঠিক আছেন কি না, স্বাভাবিক পেশায় ফিরেছেন কি না, কোনো ধরনের অসুবিধা বা আইনি সমস্যায় পড়ছেন কি না-এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তবে সুন্দরবনে এখনও সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি জলদস্যু বাহিনী। তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে এসআরবি।

  • শেয়ার করুন