যেভাবে পরম বন্ধু থেকে হত্যা মামলার আসামি ডন

প্রকাশিত: September 6, 2026

  • শেয়ার করুন

একসময় ছিলেন পরম বন্ধু। একই সিনেমায় ক্যারিয়ারের পথচলা, বন্ধুত্বের সম্পর্ক আর সালমান শাহকে ঘিরে নানা স্মৃতির সাক্ষী সেই আশরাফুল হক ডনই আজ তার মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলার আসামি। ৩০ বছর আগে ঢাকাই সিনেমার তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে যে রহস্যের শুরু, তিন দশক পরও সেই জট খোলেনি।

বরং সময়ের সঙ্গে বদলেছে তদন্তের দিক, এসেছে একের পর এক প্রতিবেদন, আদালতের নির্দেশ ও নতুন মামলা। আর ২০২৬ সালে এসে সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন খল-অভিনেতা ডন।

সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা নয়, হত্যা বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং সর্বশেষ পিবিআইয়ের তদন্তে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।কিন্তু পরিবারের নারাজি, রিভিশন আবেদন এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি আবার হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের আওতায় আসে। সেই মামলায় ২০২৬ সালে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুরোনো সেই বন্ধুত্বের সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে সময় দেশের চলচ্চিত্র জগতে তিনি তুমুল জনপ্রিয়। তার আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো চলচ্চিত্রাঙ্গন।

ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

১৯৯৭: সিআইডির প্রতিবেদনে ‘আত্মহত্যা’

অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।

সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ওই সময় থেকেই সালমানের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আইনি লড়াই দীর্ঘ হতে থাকে।

২০০৩-২০১৪: বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার প্রমাণ মেলেনি

সিআইডির প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তির পর ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। যদিও সেখানেই থেমে থাকেনি সালমানের পরিবার।

২০১৫: নীলা চৌধুরীর নারাজি

সালমান শাহর বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা নীলা চৌধুরী আইনি লড়াই চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন।

১১ জনের নাম তুলে ধরে নীলা চৌধুরী দাবি করেন, তারা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব।

২০১৬: র‌্যাবের তদন্ত বন্ধ, দায়িত্ব পায় পিবিআই

র‌্যাব তদন্ত শুরু করলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তোলে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

এরপর তদন্তের দায়িত্ব আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হাতে।

২০২০: পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন

চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ এবং জব্দ আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে পারিবারিক কলহ এবং চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়সহ বিভিন্ন কারণের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।

ওই প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্টি জানিয়ে ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে আরও তদন্ত চান নীলা চৌধুরী।

২০২১: আসামিদের অব্যাহতি

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

কিন্তু এখানেও শেষ হয়নি পরিবারের আইনি লড়াই।

২০২৫: ‘আত্মহত্যা’ থেকে আবার হত্যা মামলা

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে আবারও মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেয়। এরপর রমনা থানায় ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা করা হয়।

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খল-অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।

ডন: পরম বন্ধু থেকে মামলার আসামি

সালমান শাহর সঙ্গে ডনের বন্ধুত্বের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। পিবিআই ২০২০ সালে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানালে ডন তখন বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।’

তিনি বলেছিলেন, ‘২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।’

যদিও ওই বক্তব্যের ছয় বছর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০২৬ সালে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন ডন। বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং তার জামিনও নামঞ্জুর হয়।

মামলার বাদী সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বলেন, ‘রেজভী নামে এক আসামির বক্তব্যে ডনের সম্পৃক্ততা আসে। আমরা চাই, আসামিরা গ্রেপ্তার হোক এবং মামলার বিচার দ্রুত শেষ হোক।’

যদিও ডন এখনো কেবল হত্যা মামলার আসামি। আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। মামলার তদন্ত এখনো চলমান।

২০২৬: ৩০ বছর পরও অপেক্ষা বিচারের

তিন দশক পর সালমান শাহর মৃত্যুর মামলা আবারও তদন্তের কেন্দ্রে। ডন গ্রেপ্তার হয়েছেন, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। সর্বশেষ আদালত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী এখনো লন্ডনে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরও তার প্রত্যাশা একটাই- মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসুক, বিচার হোক।

নীলা চৌধুরী বলেন, ‘আশায় আছি, মামলার তদন্ত শেষ হবে, বিচার হবে।’

তার প্রশ্ন, ‘আসামিরা দেশে আছে, কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না বুঝতে পারছি না। ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? আসামিদের তো দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আছে। তার মানে তারা দেশেই আছে। তারপরও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না?’

তিনি আরও বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলে হত্যার সব রহস্য বেরিয়ে আসবে। আশা করছি, তদন্ত সংস্থা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করবে এবং মামলার তদন্ত শেষ করবে।’

অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান বলেন, ‘তদন্ত চলছে। এক আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’

উল্লেখ্য, তিন দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় একাধিক তদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এসেছে, আবার পরিবারের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ঘটনাটি নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তে এসেছে। ফলে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণের প্রশ্নটির চূড়ান্ত উত্তর এখনো আদালতের বিচার ও চলমান তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।

  • শেয়ার করুন